আমি একজন রিকশাওয়ালা
আমি একজন রিকশাওয়ালা
আমার নাম অমর দাস… … ..
আমি আমার স্ত্রী আর আমার ৫বছরের ছোটো একটা মেয়ে এই নিয়ে আমাদের সংসার। আমি বাংলাদেশের বরিশাল এর বাসিন্দা ছিলাম, ওখানে আমাদের ৫ বিঘা জমি ছিলো চাষ আবাদ করে আমার মা বাবাকে নিয়ে ভালোই চলে যেত। এরপর ১৯৭২ সালে অজানা রোগে মা ও বাবা ১ মাসের ব্যবধানে দুজনেই মারা গেলেন, তখন আমার বয়েস এই ১৮/১৯ বছর হবে।
এর পর বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থা আস্তে আস্তে খারাপ হতে শুরু করলো, আমি তখন একা, পরামর্শ করার কেউ নেই কি করবো ভেবে উঠতে পারছি না, অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করলাম ভারতে চলে যাবো। জমিটুকু বিক্রি করার অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু কোনভাবেই কোন ব্যাবস্থা হলোনা, এদিকে হিন্দুদের উপর অত্যাচার দিন কে দিন বাড়তে থাকল, এমন সময় এক মুসলমান বন্ধু এসে আমাকে বললো ভাই তুই আজ ই পালিয়ে যা ওরা তোকে আজ রাতেই শেষ করে দেবার মতলব করেছে, তারপর আমার হাতে ১০০০ টাকা দিয়ে বললো আর ভাবিস না বেঁচে থাকলে আবার জমি কিনতে পারবি, যা এক্ষণই পালা বলে প্রায় জোর করেই আমাকে পাঠিয়ে দিলো, যাবার সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো যদি বেঁচে থাকিস আবার দেখা হবে… … .
এরপর ১৯৭৫ সালে দালালের মারফৎ বর্ডার ক্রস করে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে এলাম।
চলে তো এলাম কিন্তু কোথায় থাকবো কি খাবো কিছুই জানি না, হাঁটতে হাঁটতে বনগাঁ শহরে চলে এলাম… . ওখানে এক রিকশাওয়ালার
দৌলতে ভাড়ায় একটা রিকশাও পেয়ে গেলাম, আরম্ভ হোল আমার জীবনের নুতন অধ্যায় ।
ফুটপাতে থাকতাম আর রিকশা চালাতাম, আস্তে টাকা জমিয়ে ১ কাঠা জমিও কিনলাম আর একটা ছোট বাড়িও হলো, তখন ১৯৮৫ সালের আশে পাশে হবে হাতে ও কিছু টাকা জমাতে পেরেছি , রোজগার ভালোই হতো এবার একটা বিয়ে করার কথা ভাবতে পারি । মেয়ে খুঁজতে আরম্ভ করলাম আর পেয়ে ও গেলাম। ওর বাবাও রিকশা চালক, দেখতে ভালো ই ছিলো মেয়েটি।
বিয়ে করে সংসার আরম্ভ করলাম, বেশ আনন্দেই দিন কাটছিলো … .. ঘর আ্লো করে একটা মেয়ে সন্তানের জন্ম ও হলো, সুখের সংসার সারাদিন পর আমি বাড়িতে ফিরে মেয়ে কে নিয়ে খেলা করতাম, বেশ আনন্দে কাটতো দিনগুলো… …
আস্তে মেয়ে বড় হোল স্কুলে ভর্তি করলাম, আমি সকালে মেয়েকে স্কুলে দিয়ে রিকশা নিয়ে কাজে বেরিয়ে যাই আর মা স্কুল থেকে নিয়ে আসে, এইভাবে দেখতে দেখতে মেয়ের বয়স ৫ বছর হয়ে গেল , এর পর তো হাই স্কুলে দিতে হবে… এদিকে অটো আর টোটো র জ্বালায় রোজগার কমতে থাকলো, মেয়ের স্কুলের বেতন ও বই খাতা কিনে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে, কি করবো বুঝে উঠতে পারছিনা , একটা টোটো যে কিনবো তার ও উপায় নেই, দুর্দশা আর পিছু ছাড়ছেনা… … ..
এই করতে করতে পুজো চলে এলো। আজ মহালায়া। ভোর ৪টেতে রিকশা নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছি , লোকে গঙ্গায় আজ তর্পণ করতে যাবে, আশা করছি আজ রোজগার ভালোই হবে, পুজোয় তো মেয়েটাকে একটা নুতন জামা কিনে দিতে হবে… . কিন্তু আমার আশা আজ ও পূর্ণ হোলোনা যথারীতি অটো আর টোটো সব আশায় জল ঢেলে দিলো। দিনের শেষে যখন এ ফিরলাম মেরে কেটে ২০০ টাকার মতো রোজগার হয়েছে, এর থেকে সংসার চালাবো না মেয়ে কে পুজোর জামা কিনে দেবো.... বাড়ি ফিরতেই মেয়ে জড়িয়ে ধরে আমাকে আদর করে জিজ্ঞাসা করছে বাবা স্কুলের বন্ধুদের সকলের তো পুজোর জামা কেনা হয়ে গেল, আমাকে কবে কিনে দেবে ? আমি ও মেয়ে কে আদর করে বললাম কাল দেবো মা… সারারাত ঘুমোতে পারিনি কাল যদি একই অবস্থা হয় মেয়েকে কি বলবো। এই ভাবে মেয়েকে রোজ ই এক কথা বলে ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছি, আজ ষষ্টি , মেয়েকে যখন স্কুলে নিয়ে যাচ্ছি তখন মেয়ে আমায় বলছে বাবা আজ কিন্তু আমার জামা নিয়ে আসবে, কাল নুতন জামা পড়ে ঠাকুর দেখতে যাবো।কি আর করি, আমি বললাম আচ্ছা মা আজ নিশ্চয়ই নিয়ে আসবো।
সকাল থেকে রাত ৮ টা বেজে গেল এখন ও সেরকম রোজগার হয় নি, কি করবো ভাবছি এমন সময় শুনলাম ট্রেন গণ্ডগোল, ট্রেন চলছে না, শুনে একটু ভরসা পেলাম… … . রাত ১০ টা বাজে ৭০০ টাকা মতো রোজগার হয়েছে ।
এবার দোকানে গিয়ে মেয়ের জন্য একটা ভালো দেখে জামা আর জুতো কিনে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম, এমন সময় এক ভদ্রলোক এসে জিজ্ঞেস করলো ভাই নাটাগ্রাম যাবে ? আমি বললাম দাদা সে তো অনেক দূর… . ভদ্রলোক বলছে আমার কোন উপায় নেই ভাই যতো রাত ই হোক আমাকে বাড়িতে যেতে হবে আমি তোমাকে ১০০০ টাকা দেবো। আমি তো চিন্তায় পড়ে গেলাম কি করবো... টাকারও তো দরকার টাকাটা নেহাত কম নয়, যাই হোক আর না ভেবে রাজী হয়ে গেলাম… …
নাটাগ্রাম পৌছোতে রাত ৩ টে বেজে গেলো, ভদ্রলোককে তার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে ১০০০ টাকা পকেটে নিয়ে রিকশা ঘুরিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম, কিছুক্ষণ যাওয়ার পর দেখি একটা চায়ের দোকান খোলা.. আমি ওখানেই জল দিয়ে মুখ টা ধুয়ে দোকানদার কে বললাম এক কাপ চা দেবেন ভাই, সেখান থেকে চা বিস্কুট খেয়ে ওখানেই একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার রওয়ানা দিলাম… …
শরীরটা খুব ভালো লাগছে না প্রচুর পরিশ্রম হয়েছে , ভাবছি সকালে গিন্নীর জন্য ও একটা শাড়ী কিনবো… আর চালাতে পারছিনা খুব কষ্ট হচ্ছে, সকাল ৯ টা বেজে গেল, বাড়ির কাছেও এসে গেছি। হর্ন বাজাতে গিন্নী বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে এসে আকুল হয়ে প্রশ্ন করছে সারা রাত কোথায় ছিলে?
অমর কোন উত্তর দিলো না..... রিকশা থেকে পড়ে গেলো। আসলে ওর কোনো জ্ঞানই ছিলনা।
এরপর আর কি... গিন্নীর চেঁচামেচি - পাড়ার লোকজন - ডাক্তার এসে বলে গেল
"SORRY HE IS NO MORE"
অমর দাস এর জীবন সংগ্রাম এভাবেই শেষ হোলো…………………………………

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Please do not enter any spam link in the comment box.