সৎ পুলিস অফিসার
সৎ পুলিস অফিসার
ইলেক্ট্রনিক্স
ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর কয়েকটা কোম্পানি তে চাকরী করেছি, এর মধ্যে বিয়ে টা ও সেরে
ফেলেছিলাম একটা মেয়ে হয়েছে,
তারপর মনে
হোল আর চাকরী করবো না, নিজের ই একটা ইলেক্ট্রনিক্স এর ব্যেবসা করবো-------
একটা দোকান ঘর খুঁজতে আরম্ভ করলাম, জিটি রোড এর উপর একটা দোকান ঘর ও পেয়ে গেলাম, ১৯৮৩ সালের ১লা বৈশাখ গণেশ পুজো দিয়ে আমার ব্যেবসা আরম্ভ করে দিলাম,
নুতন দোকান তখনো ভালো করে ব্যেবসা জমে উঠে নি, মাস দুই এক চলার পর একদিন সকাল ১১ টা ১১.৩০ টা হবে আমি দোকানে কাজ করছি এমন সময় একটা পুলিশ এর জীপ এসে আমার দোকানের কাছে দাঁড়ালো, ভাবলাম কি ব্যেপার আমার দোকানে পুলিশ কেন ? জীপ থেকে একজন পুলিশ অফিসার নেমে দোকানে এসে আমার সঙ্গে পরিচয় করে বললেন আমার নাম তন্ময় দাস (নাম পরিবর্তিত) আমি ভদ্রেস্বর থানা র ২য় অফিসার, আমার এলাকায় একজন ইওং ছেলে দোকান করেছে তাই দেখতে এলাম, দোকান টা ভালো করে দেখে বললো বেশ ভালোই দোকান টা সাজিয়েছ-----
আমি বললাম বসুন স্যার বলে বসতে দিলাম আর আমার কর্মচারী কে বললাম যা চা নিয়ে আয় , চা টা খেলেন সিগারেট দিলাম সেটা ও নিলেন, আমাকে বললেন তোমার কাছে তো রেকর্ডের খুব বেশি কালেকশন নেই ( তখন রেকর্ডের চল ছিল ) হ্যাঁ স্যার নুতন দোকান তো পরে কালেকশন আরও বাড়াবো,
উনি আমাকে
বললেন আমি তোমাকে কিছু রেকর্ডের লিস্ট দিয়ে যাচ্ছি সেগুলো আমাকে এনে দিও তো ভাই বলে আমাকে
১৫ টা মতো এল পি রেকর্ডের লিস্ট দিয়ে
যথা রিতি পরের সপ্তাহে সবে দোকান খুলেছি উনি রেকর্ড নিতে চলে এসেছেন, আমি ভাবলাম আজ সকালটা ভালোই মনে হচ্ছে, আমি চা আনতে বললাম চা সিগারেট খেলেন রেকর্ড গুলো হিসাব করে ক্যেসমেমো সমেত উনার হাতে দিলাম সব দেখে শুনে বললেন তাহলে সবগুলো পাওয়া গেছে, আমার থেকে আর একটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে সেটা ধরিয়ে বললেন ঠিক আছে আসি ভাই ভালো করে ব্যবসা করো আমার আশীর্বাদ রইলো বলে জীপের দিকে হাঁটা দিলেন, আমি বললাম স্যার টাকাটা বোধয় দিতে ভুলে গেলেন,
উনি বললেন
কিসের টাকা? আমার এলাকায় দোকান করেছ আর আমার কাছে ই টাকা চাইছ বলে জীপে উঠে চলে গেলেন-----
আমি বোকার মতো চেয়ে থাকলাম,
এর পর থেকে
পুলিশ কে আমি ভীষণ ঘেন্না করি।
আর এক পুলিশ অফিসার, উনার জীবনের ঘটনাগুলো আজ আপনার সঙ্গে সেয়ার করবো---
এর পর আরও ২/৩ মাস পর আবার একজন পুলিশ অফিসার বিকেলে সাইকেলে করে আমার দোকানে এসে আমার সঙ্গে পরিচয় করে বললেন আমি ভদ্রেস্বর থানায় তন্ময় দাস এর যায়গায় এসেছি উনি ট্রান্সফার হয়ে গেছেন, আমি অনিচ্ছা সত্যে ও উনাকে বসতে বললাম, উনি বসে নিজের সম্বন্ধে সব কিছু বললেন আর আমার কাছে ও আমার সব জেনে নিয়ে বললেন ভালোই হয়েছে, আমি কি রোজ ডিউটি থেকে ফেরার সময় তোমার এখানে আসতে পারি ? আমি অনিচ্ছা সত্যে ও বললাম, হ্যাঁ নিশ্চয়ই আসবেন, সেদিন কিন্তু আমি চা এর কথা একবার ও বলিনি, উনি নিজের থেকে টাকা বের করে আমার কর্মচারী কে বললেন ভাই চা আর সিগারেট নিয়ে এসো না , আমিও ভদ্রতার খাতিরে বললাম না স্যার আপনি কেন পয়সা দেবেন ? আমি আনাচ্ছি----
সঙ্গে সঙ্গে উনি বললেন না ভাই আমি যে ঘুসের টাকাগুলো ভাগে পাই সেগুলো আমি তো বাড়িতে নিয়ে যাই না, সেগুলো তো খরচা করতে হবে, এর পর আর আমার কিছু বলার থাকে না----
ভদ্রলোকের নাম স্বদেশ ব্যেনারজী ঐ সময় বয়েস হবে ৪৫ অথবা ৪৬, লম্বা ৬ফূট এর ওপর, বেশ রগুড়ে ছিলেন, আমাদের দোকানের লাইনে মোট ১২ জন দোকানদার ছিলো সাতে কর্মচারী মিলিয়ে ৩০ জন মতো ছিলো, রোজ বিকেলে অফিস থেকে ফিরে আমার দোকানে বসতেন আর সকলকে খাওয়াতেন, যতো ঘুষের টাকা পেতেন সবটা ই রোজ খরচ করতেন, আমি তো এরকম মানুষ আমার জীবনে আর একজন ও দেখিনি ।
এই ভাবে ই চলছিলো , ভদ্রলোকের বয়েস তখন ৫৮/৫৯ হবে একদিন উনার বাড়ীতে গেলাম উনার টেলিভিশন টা একটু গণ্ডগোল করছিলো সেটা দেখার জন্য, বিকেল বেলায় গেলাম টেলিভিশন টা দেখার জন্য, বাড়ীটা নিজের ই বাড়ী ছোট্ট তিন কামড়ার বাড়ী, বাড়ীটা ছোটোর মধ্যে ভালোই, এতো বছরে আমার সেদিন ই প্রথম উনার বাড়ীতে যাওয়া, উনি উনার স্ত্রী সঙ্গে পরিচয় করালেন,
ভদ্রমহিলা ভীষণ ঠাণ্ডা স্বভাবের, আমি কাজ সেরে উনার সাথে বসে চা খেতে খেতে গল্প করছি, এর মধ্যে উনি উনার ফ্যামিলির সম্বন্ধে সব বললেন, উনার দুই মেয়ে দুজন ই ৩০ এর উপর বয়েস হবে, এক ছেলে ছোট ২৬/২৭ বছর বয়েস হবে,
দুই মেয়ের ই বিয়ে দিয়েছিলেন দুজনেরই বিয়ে টেকে নি আর ছেলেটার ও কোন চাকরী হয়নি, সকলেই স্নাতক, বাড়ীতে সামান্য কিছু টিউশনি করে, নিজেদের হাত খর্চা চলে ভদ্রলোকের উপর পুরো সংসার এর দায়িত্ব, তখন পুলিশ এর চাকরীর মায়না খুব বেশী ছিলোনা, ভীষণ কষ্টে সংসার চলতো কিন্তু ঘুষের টাকা বাড়ীতে নিয়ে যেতেন না--- আমি এরকম পুলিশ একজন ও আমার জীবনে দেখিনি,
সঞ্চয় বলতে প্রায় কিছুই ছিল না, কিন্তু বাইরের থেকে দেখে কেউ বুঝতেই পারতো না উনার ভেতরের কষ্ট টা, খুব মজাদার লোক ছিলেন সারাদিন সকলের সঙ্গে হাসি মজা করে কাটিয়ে দিতেন-------
তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন, আরও বছর খানিক পর চাকরির থেকে অবসর নিলেন, যেদিন তিনি অবসর নিয়ে বিকেল বেলায় আমার দোকানে যথারীতি এসে বসে বললেন আজ আমি সকলকে নিয়ে পিকনিক করতে চাই আমি ই সব খরচ করবো কাল থেকে তো আর কিছু করতে পারবোনা, আজ আমার অফিস এর শেষ দিন কিনা বলে ৫০০ টাকা দিয়ে বললেন যাও বাজারে পাঠাও, তখন ৫০০ টাকা অনেক টাকা আমার ছেলেটাকে বললাম যা কাওকে সঙ্গে নিয়ে বাজার করে নিয়ে আয়, লিস্ট করে দিলাম ছেলেটি বাজার করতে চলে গেলো, আমি আমার দোকানের ছেলেটা কে বললাম যাবার সময় সকল কে জানিয়ে দিয়ে যা , সকলে শুনে একে একে আমার দোকানে হাজির হোল, আমরা সকলে মিলে উনার এবং বউদির জন্য এক জোরা সাল কিনলাম আর একটা ফুলের তোরা নিলাম এবং এক প্যাকেট সূর্য মোদক এর মিষ্টি উপহার দিলাম, সেদিন টা আমরা উনাকে নিয়ে খুব আনন্দ ফুর্তি করে কাটালাম, সেদিন আমাদের বাড়ি ফিরতে রাত ১২ টা বেজে গিয়েছিলো, বাড়িতে ও খুব চিন্তা করছিলো, তখন তো মোবাইল ছিলোনা যে বাড়িতে খবর দেবো।
যথারীতি পরের দিন সকালে দোকান খোলার পর বসে কাজ করছি ১১ টা নাগাদ হবে ভদ্রলোক আমার দোকানে এলেন, বললেন আজ সকাল সকাল চলে এলাম তোমাকে ডিস্টার্ব করতে, আমি বললাম দাদা কি যে বলেন আপনাকে তো আমি নিজের দাদার মতই ভাবি যখন খুসি আসবেন, যাই হোক সেদিন আর উনি বেশিক্ষণ বসেন নি।
এইভাবে ই চলছিলো দিন ১৫ বাদের থেকে উনি হঠাৎ আর দোকানে আসছেন না, আমার তো চিন্তা আরম্ভ হয়ে গেলো, ভাবলাম রবিবার উনার বাড়িতে গিয়ে খবর নিয়ে আসবো, রবিবার আসতে আরও দুদিন বাকি আছে, যথারীতি রবিবার দোকান খোলার পর কাজ করছি ( আমার দোকার বৃহস্পতি বার বন্ধ থাকতো), ১২ টা নাগাদ হবে সদেশ দা দোকানে এসে হাজির, উনাকে দেখে দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যেপার বলা নেই কওয়া নেই কোথায় উধাউ হয়ে গেছিলেন ? উনি বললেন বলছি বলছি, উনি যা বললেন শুনে তো আমার মাথা ঘুরে গেলো, বললেন হাওড়া একটা কারখানায় সিকিউরিটি সুপারভাইজার এর কাজ নিয়েছেন, ভদ্রেস্বর থেকে সাইকেলে রোজ ডিউটি করতে যান, আমি জিজ্ঞেস করলাম এখান থেকে কতো দুরত্য হবে ? উনি বললেন আমাদের কারখানা আমার বাড়ির থেকে ২০ কিলোমিটার রাস্তা,
আমি বললাম আপনি কি খেপেছেন? রোজ ৪০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে কদিন আপনি চালাতে পারবেন তাও আবার ৬০ বছর বয়েসে, উনি বললেন কি করবো ভাই সংসার তো চালাতে হবে, পেনশন এর টাকায় তো সংসার চলবেনা-- কাছাকাছি পেলে ছেড়ে দেবো শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো যাই হোক এই ভাবে ই চলছে রবিবার দিন উনার সাথে আমার দেখা হতো।
আমার দোকান টা ছিল জুট মিল এরিয়াতে, এদিকে আমাদের এলাকার সব মিলগুলো এক এক করে বন্ধ হয়ে গেলো, (আমাদের ব্যাবসা মিলের উপর বেস করেই চলতো) ব্যাবসার অবস্থা খুব খারাপ কি করবো ভাবছি, স্থির করলাম এই মিল এর ঝামেলা কোনদিন ঠিক হবে না আমি এখান থেকে ব্যাবসা গুটিয়ে স্টেশন এলাকায় নিয়ে যাবো এবং তাই করলাম, তখন ছিল ১৯৯৬ সাল আমি এবার স্টেশন এর কাছাকাছি একটা দোকান নিয়ে ব্যাবসা আরম্ভ করলাম এবং খুব তাড়াতাড়ি এখানেও আমার ব্যাবসা দাঁড়িয়ে গেলো, রবিবার করে স্বদেশ দা আমার বাড়িতে আসতেন, আবার কোন কোন রবিবার আসতেন ও না পরবর্তী কালে আসা অনেক কমে গেলো, আমার ও কাজের চাপে আর খোজ নেয়া হতো না।
২০০২ সালে শেষবার স্বদেশ দা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন বললেন বাড়ির থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে একটা কারখানা য় কাজ পেয়েছেন এখন ওখানেই কাজ করছেন, আমি বললাম যাক ভালোই হয়েছে। তারপর থেকে আর স্বদেশ দার সাথে আর দেখা হয় নি--------
স্বদেশ দার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, আমি ও এখানে ব্যাবসা করছি সময় খুব কম, প্রচুর খাটনি, ভালোই চলছে, ২০০৫ সাল হবে আমাদের পুরনো একজন দোকানদারের সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো, আমার দোকানে এনে ওখানকার সব খবরা খবর নিলাম, তারপর স্বদেশ দার খবর জানতে চাইলাম, ও আমাকে যা বলল আমি তো আকাশ থেকে পরলাম, দিন ১০ হবে স্বদেশ দা সাইকেল থেকে পরে হার্ট এটাক করে সাথে সাথে মারা গেছেন, আজ বোধহয় স্রাধ্য, আমি একেবারে চুপ হয়ে গেলাম------
তক্ষণই দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে গেলাম বাড়িতে সকলকে খবর টা বললাম, সকলের ই মন খারাপ হয়ে গেলো--- সন্ধাবেলা ফুল আর মিষ্টি নিয়ে স্বদেশ দার বাড়িতে গেলাম তখনো ছবিটা স্রাধের যায়গায় বসানো ছিল, মালা পরিয়ে শেষ স্রধা জানালাম--- বৌদি আমার কাছে এসে কেঁদে বলতে লাগলো ঠাকুরপো আপনার দাদাকে বাঁচাতে পারলাম না, আমি কোন ভাষা খুঁজে পেলাম না সান্তনা দেবার, বৌদি সব বললেন কিভাবে সাইকেল থেকে পরে গিয়ে স্ট্রোক হয়ে চলে গেলেন, এক দিনের জন্য ও সংসার ছাড়া কিছু ভাবেনি, যে কোনদিন ঘুস এর টাকা বাড়িতে নিয়ে আসেনি তার কেন এমন হোল ? এর পর যে কি হবে জানিনা-----------
ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম সেদিন সারা রাত ঘুমোতে পারিনি, একজন সৎ লোকের এরকম পরনতি কেন হোল নিজের মনকেই প্রশ্ন করলাম।
এই ভাবে একজন সৎ পুলিশ অফিসার জীবন শেষ হয়ে গেলো--------
আমার আরও কিছু লেখা যদি পড়তে চান, নিচে আমার দেয়া লিংক য়ে ক্লিক করে পড়তে পারেনঃ-
https://manas1952chatterjee.blogspot.com/

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Please do not enter any spam link in the comment box.