এক জুটমিল ওয়ার্কার এর করুন কাহিনী

আজ আমার জীবনের  আরও একটা ঘটনা শোনাবো ঃ-

এটাও কিন্তু একই ধরনের ঘটনা 

তখন আমার মা বেঁচে ছিলেন , ১৯৯১/১৯৯২ হবে , আমার তখন টেকনিসিয়ান হিসাবে বেশ নাম ডাক ছিলো , আমার ইলেক্ট্রনিকক্স  এর দোকান ছিলো জিটি রোড এর ওপর  ভালই  চলতো  আমার দোকান টা, আমাকে সকলে খুব ভালো ও বাসত , আমার যেখানে দোকান ছিলো সেটা পুরোটা ই জুটমিল  এলাকা, তবে আমাদের ব্যেবসার একটা অসুবিধা ও  ছিলো, যখন মিলগুলো বন্ধ থাকতো তখন আমাদের ব্যেবসা ভালো চলতো না, 

যে সময় টার কথা বলছি  সেই সময় টা  টানা ৬ মাস সব মিল গুলো বন্ধ ছিলো , সে সময় আমার খুব একটা অসুবিধা হয়নি কারন আমি তো নিজে রেপুটেড  টেকনিসিয়ান  ছিলাম, কাজ করতে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে হতো, আমার সঙ্গি ছিলো  “রয়াল এনফিল্ড বুলেট “, এক এক দিন প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত রান করতে হতো ,   

দোকান টা মিল এলাকায় ছিলো বলে  , ওই সময় সেই এলাকায় কাজ করতে গিয়ে কোন বাড়ির থেকে পয়সা পেতাম আবার কোন বাড়ির থেকে পেতাম ও না, ওদের ওই সময় বাড়ির জিনিস বিক্রি করে করে সংসার চলতো , যেদিনের কথা বলছি  সেদিন বাইরে কাজ ছিলো না দোকানে বসে ই কাজ করছি  মোটামুটি সন্ধ্যা ৭ টা হবে ,  হঠাৎ দেখি একজন সাইকেলে করে আমার দোকান এর কাছে দাঁড়ালো কিছু বুঝে উঠার আগে আমার পায়ে পরে কাঁদতে আরম্ভ করল আর বলতে লাগলো মানস দা আমাকে বাঁচাও, আমি তাকে তুলে ধরে বললাম কি হয়েছে রে ইদ্রিস , এরকম করছিস কেন , আমার টি ভি  টা খারাপ হয়ে গেছে এখনি চলো না হলে আমার ছেলে মেয়ে গুলো কে আর সামলাতে পারছি না, কেন কাল গেলে হবে না ?  আর কাঁদছিস কেন ? তুমি চল বাড়িতে গিয়ে বলছি , আমি বললাম ঠিক আছে তুই যা আমি আসছি  ও তো আচ্ছা বলে চলে গেল , এদিকে আমার একজন কর্মচারী ছিলো সে বলল যাও মানস দা কিছু টাকা গচ্ছা দিয়ে এসো , আমার নেচার টা তো ওরা  জানতো । 

যাই হোক আমি তো কাজের ব্যাগ টা আর কিছু টাকা ক্যাশ থেকে নিয়ে মোটর সাইকেল নিয়ে ওর বাড়িতে  গেলাম , আমি তো কি হবে আগের থেকে জানি , বাড়ির মধ্যে ঢুকে দেখি  ৪ টে বাচ্চা খুব কাঁদছে আর ওদের মা ও কাঁদছে , আমি ওর বিবি র হাতে ২০০ টাকা দিয়ে বললাম যাও বাচ্চা গুলোর জন্য কিছু খাবার নিয়ে এসো, আগে ওদের কে কিছু খেতে দাও তারপর তোমাদের জন্য চাল ডাল কিনে আনবে  বলে আরও ১০০ টাকা দিলাম, (ওই সময় ৩০০ টাকা এখন কার ১০০০ টাকার সমান ) ওর বিবি খাবার আনতে চলে গেল আর আমি টি ভি খুলে সারাতে সারাতে ইদ্রিস মিয়া সঙ্গে কথা বলছি আর কাজ করছি, কিছুক্ষণ পর ওর বিবি বাচ্চা দের জন্য কিছু শুকনো খাবার নিয়ে এলো , বাচ্চাগুলো যে কি আনন্দ খাবার গুলো দেখে, ভাষায় বোঝাতে পারবো না আমার ও চোখে জল চলে এলো , ওর বিবি বাচ্চাদের খাবার গুলো দিয়ে আবার চাল ডাল আনতে বেরিয়ে গেলো । 

এর পর আমার কাজ শেষ করে হাত ধুয়ে ইদ্রিস মিয়া র সঙ্গে কথা বলছি  এমন সময় ওর বিবি ও চলে এলো , ওর বিবি বলছে দাদা একটু বসুন চা বানাচ্ছি  আমি বললাম চা বানাতে হবে না তুমি তোমাদের জন্য রান্না কর , ও বলল না দাদা চা একটু খেতে ই হবে আমি বললাম ঠিক আছে বানাও ।

এবার আসল ঘটনা টা বলি সকাল থেকে ওদের কিছু খাবার জোটেনি আসে পাসে কাউকেই পায়নি যে ওদের কিছু সাহায্য করবে , পাবে কোথা থেকে সবার  তো একই অবস্থা , ইদ্রিস বলল ভেবেছিলাম টি ভি টা ঠিক করে দিলে হয়তো বাচ্চা গুলো শান্ত থাকবে , আমি বললাম টি ভি দিয়ে কতক্ষণ শান্ত রাখতিস , মাঝে মাঝে আমার দোকানে তো গিয়ে কাজ করতে পারিস  আমার তো নানা রকম কাজ থাকে , ইদ্রিস আবার আমার পায়ে হাত দিয়ে  বলল বাঁচালে দাদা, কাল থেকে যাবি কিন্তু ।

যাই হোক ওদের বাড়ির থেকে সেদিন আমার আসতে রাত ১০ টা বেজে গেছিলো , মন টা এতো খারাপ হয়ে গেছিলো যে দোকানে এসে আর কাজে বসতে ইচ্ছে করলো না  কর্মচারী কে বললাম নে দোকান বন্ধ করে দে আজ আর কাজ করবো না , অন্য দিন রাত সারে এগারটা বারোটা পর্যন্ত কাজ করতাম ।


আমি  আমার মা কে গিয়ে এসব ঘটনা  গুলো রোজ বলতাম, দোকান থেকে বাড়ি আসলে মা বুঝে যেতো কিছু একটা হয়েছে মায়ের কাছে কিন্তু লুকোতে পারতাম না । এরকম ঘটনা গুলো মা ছাড়া আর  আমাদের বাড়িতে কিন্তু কেউ জানতো না, এর জন্য মা কিন্তু আমাকে কোনদিন কিছু বলেনি আর কাউকে কিছু বলে ও নি।

এতগুলো বছর পেরিয়ে গেল আজ ও সেদিনের ঘটনা টা আমার সম্পূর্ণ মনে আছে , এগুলো কিন্তু আমার জীবনের ১০০% সত্যি ঘটনা এক বর্ণ ও মিথ্যে নয় , এখনও বাজারে গেলে এরকম ঘটনা হামেসাই হয় , তখন ছিলো কিছু বেশি এখন কিছু কম এই যা তফাৎ ,  আমি কিন্তু নিজেকে একটুও বদলাতে পারিনি । 

কি করবো আমি তো এরকমই  

ভাষাগত কিছু ভুল থাকলে মার্জনা করবেন ঃ-   


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আমি একজন রিকশাওয়ালা

সৎ পুলিস অফিসার

আবিরের নরক যন্ত্রণা