এক অসহায় মহিলার গল্প
এক অসহায় মহিলার গল্প
আমার নাম দিবাকর বর্মণ
আমি স্টেট গভমেণ্ট এর ক্লার্ক এর চাকরী করতাম, অবসর নিয়েছি বছর দুই হবে, পেনশন খুব
বেশী পাইনা, মেরেকেটে ৯০০০ টাকার মতো, এর থেকে ২০০০ টাকা প্রতি মাসে সরিয়ে রাখি, আমার
গিন্নী জানে আমি ৭০০০ টাকা পেনশন পাই, মাসের প্রথমে পেনশন নিয়ে এলেই গিন্নী পুরো ৭০০০
টাকা নিয়ে নেয় আর বলে তোমার টাকা কিসের দরকার, আমি খুব নিরীহ মানুষ কিনা তাই কিছু বলতে
পারিনা, ছেলে মোটামুটি ভালো চাকরী করে, এখন সংসারে আমার কোন প্রয়োজন নেই, শুধু বাজার
করার সময় টাকা লিস্ট আর ব্যাগ হাতে দিয়ে বলে উলটো পাল্টা খরচ করবে না আমি কিন্তু হিসাব
নেবো, এই ভাবে ই দিন চলে… … ..
শীতের সকাল বারান্দায়
ইজি চেয়ারে বসে হাতে পেপার টা নিয়ে পেপার পড়ছি, গিন্নী এক কাপ চা দিয়ে ভেতর চলে গেছে,
এমন সময় একজন মাঝ বয়েসি ভদ্রমহিলা গেট টা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো, দেখে মনে হয় কোন
সম্ভ্রান্ত পরিবার এর হবে , ভদ্রমহিলা কে দেখে আমার কেন জানিনা ভীষণ মায়া হোলো আমার
সামনে দাড়িয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো গেটের আওয়াজ পেয়ে ভেতর থেকে আমার গিন্নী বাজখাই
গলায় বলতে লাগলো কে এলো, এখন কিন্তু কোন ভিক্ষা দিতে পারব না, আমি বললাম চেঁচামেচি
করছ কেন ? ব্যাস আরম্ভ হোয়ে গেলো, কিছু দেখলো না শুনলোনা ভাঙ্গা রেকর্ড চলতে আরম্ভ
করলো, নিজের কোন মুরোদ নেই ছেলের অন্ন ধ্বংস করছে আবার উপকার করার শখ, মানুষ রিটায়ার্ড
হয়ে গেলে বাড়ির গিন্নী র কাছে বোঝা হয়ে যায়, যাক গে এ তো রোজকার ঘটনা।
আমি ভদ্রমহিলা কে হাতের
ঈশারায় দাঁড়াতে বলে আমি ভেতরে গেলাম চুপি আমার একটা ছোট বাক্স আছে এখান থেকে ২০০ টাকা
নিয়ে এসে ভদ্রমহিলার হাতে দিয়ে নিচু গলায় বললাম আমি রোজ বিকেলে পার্কে যাই ওখানে তুমি
দেখা করো, ভদ্রমহিলা ২০০ টাকা নিয়ে চলে গেল। এমন সময় গিন্নী বারান্দায় এসে গিজ্ঞেশ
করছে কে এসেছিলো, আমি বললাম এক ভদ্রমহিলা এসেছিলো, তুমি যা চ্যাঁচামেচি আরম্ভ করেছো,
কোন কথা না বলে ই চলে গেল। গিন্নী বললো যাক ভালোই হয়েছে তুমি কোন টাকা পয়সা দাও নি
তো ? আমি বললাম আমি টাকা কোথায় পাবো পেনশন এর সব টাকা তো তুমি ই নিয়ে নাও…
…
বিকেল বেলা ৫ টা নাগাদ
হবে আমি পার্কে গিয়ে দেখি ভদ্রমহিলা একটা বেঞ্চে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে, আমি কাছে
যেতে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করলো আর কাঁদতে লাগলো, আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম
কাঁদছ কেন ? আমি তো তোমার বাবার মতো নির্দ্বিধায় তুমি আমাকে সবটা বল কি হয়েছে ।
আমি ও পাশে গিয়ে বসলাম,
এবার ভদ্রমহিলা বলতে আরম্ভ করলো, আমার স্বামীর নাম দিনেস রায় চাকরী করতেন ডানলপ কোম্পানি
তে খুব ভালো মায়না ছিলো বেশ আনন্দেই ছিলাম, শুধু আমাদের কোন ছেলে পুলে ছিলো না এই যা
দুঃখ, আমার স্বামী র ও আপনার মতো অন্য কে উপকার করার নেশা ছিল , যা মায়না পেতো তার
অর্ধেক টাকা অপর কে উপকার করতেই চলে যেতো, বাকি যা থাকতো তা দিয়ে আমাদের বেশ ভালোই
চলে যেতো, আমিও কোনদিন বাঁধা দেই নি… … ..
সব ঠিক ঠাক ই চলছিলো
, ব্যাংক ব্যাল্যান্স ও ভালো ছিলো, আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, কম্পানির
কোয়াটার এ থাকতাম তখনও ১৫ বছর চাকরী ছিলো … .
হঠাৎ একদিন সকালে কাজে
গিয়ে দেখে কোম্পানি লক ডাউন ঘোষণা করে দিয়েছে , শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো, আমি আমার
স্বামী কে সান্তনা দিয়ে বললাম চিন্তা করোনা দুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে…
… ..
এই ভাবে এক দিন এক দিন
করে ৬ মাস হয়ে গেল কারখানা খোলার নাম নেই, একদিন দেখলাম কারেন্ট কেটে গেছে , জল টা
তখনও পাচ্ছিলাম… . আস্তে এক করে কোয়াটার খালি হতে লাগলো,
এভাবে প্রায় ২ বছর চলার পর ডানলপ কোয়ার্টার কম্পাউন্ড শ্মশানপুরী হয়ে গেলো, মাত্র ৪/৫
টা পরিবার তখন ও ছিলো, আর থাকতে সাহস পেলাম না, চারিদিকে ৯০ শতাংশ কোয়াটার খালি হয়ে
গেছে
একটা ছোট বাড়ি ভাড়া করে
কোয়াটার ছেড়ে দিলাম । টাকা পয়সা ও আস্তে শেষ হয়ে যেতে থাকলো, সেই সময় আমার স্বামীর
ক্যান্সার ধরা পড়লো , যেটুকু টাকা পয়সা ছিলো চিকিৎসা করতে সব খরচ হয়ে গেলো, এখন আর
চিকিৎসা করাতে পারিনা, দুবেলা খাওয়ার ই জোটে না তা আবার চিকিৎসা…
চোখের সামনে লোকটাকে শেষ হয়ে যেতে দেখছি… … ..
আমি আপনার কাছে এসেছিলাম
যদি আপনার বাড়িতে একটা ঝিয়ের কাজ পাওয়া যায় নাহলে কথাও না কথাও একটা কাজ যোগার করে
দিন, তাহলে দুবেলা কোন রকম বেঁচে থাকতে পারি, ওর কথা শুনে আমি সান্তনা দেয়ার ভাষা খুঁজে
পেলাম না কিছুক্ষণ ছুপ থেকে আমি ওকে বললাম আমার তো বাড়িতে কোন ডিসিশন নেয়ার অধিকার
নেই, আমি তো আমার বাড়িতে কোন কাজ ও দিতে পারবো না, তবে একটা কাজ করো কাল একবার পার্কে
এসো দেখি যদি কিছু করা যায় ।
যথারীতি আমি পার্কে এসে
দেখলাম ভদ্রমহিলা বসে আছে, আমি পকেট থেকে ১৬০০ টাকা দিয়ে বললাম আমি তোমাকে প্রতিমাসে
১৮০০ টাকা করে দেবো, আমি পেনশন এর থেকে ২০০০ টাকা করে সরিয়ে রাখি এর থেকে তোমাকে আমি
আমার কাছে ২০০ টাকা রেখে বাকিটা দেবো, তুমি প্রতিমাসে ২ তারিখে এসে টাকাটা নিয়ে যেও,
আমার তো কোন খরচা নেই আমার এই ২০০ টাকা হলেই চলবে । ভদ্রমহিলা টাকাটা নিতে চাইছিলোনা
আমি যোর করে টাকাটা হাতে গুঁজে দিয়ে বললাম তুমি যদি আমার মেয়ে হতে তাহলে ? এবার মেয়েটি
টাকা নিয়ে আবার আমাকে প্রনাম করে কাঁদতে বলছিলো আপনি মানুষ নয় ভগবান ।
এভাবে আরও দুমাস চলার
পর একদিন পার্কে গিয়ে দেখি মহিলা আমার জন্য অপেক্ষা করছে, সেদিন ২ তারিখ ছিলোনা সেদিন
আমি একটু অবাক ই হয়ে গিয়েছিলাম,কাছে যেতে আমাকে প্রনাম করে বলল কাকাবাবু আমি একটি নার্সিং
হোমে এ আয়ার চাকরী পেয়েছি বেতন ৩৫০০ টাকা, এবার আপনার আর টাকাটা নাদিলেও হবে, আমি বললাম
সেকিগো তোমার স্বামী র চিকিতসার জন্য টাকাটা তো লাগবে, না করোনা ।
যাই হোক মনে আমি আরও
একটু আশ্বস্ত হলাম যে এবার ওর স্বামীর জন্য একটু ভালো পথ্য দিতে পারবে, আমার বেশ ভালো
লাগলো আমি প্রফুল্ল মনে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম…
…
যথারীতি এভাবে আরও মাস
তিন এক চললো, হঠাৎ একদিন দেখি মেয়ে টা আসা বন্ধ করে দিলো, আমি ভাবলাম ওর স্বামী র কি
বাড়াবাড়ি কিছু হোলা… আরও ২ মাস অপেক্ষা করার পর আর থাকতে
না পেরে আমি ওর খোঁজ করতে বেরলাম, ও বলেছিলো সাহাগাঞ্জ এ থাকে কিন্তু সাহাগঞ্জ এ কোথায়
থাকে জানিনা সেখানে গিয়ে খোঁজ করতে প্রায় ৩০ মিনিট পর ওর বাড়ি পেয়ে গেলাম,
আমি দরজার কড়া নাড়তে
ভেতর থেকে মেয়েটি বিধবার বেশে বেরিয়ে এলো, আমি ওকে দেখে মুখের কথা হারিয়ে ফেললাম, আমাকে
দেখে মেয়েটি অঝোরে কাঁদতে বলছিলো আমি আর ওকে বাঁচাতে পারলাম না কাকাবাবু, তিন মাস হলো
আমাকে ছেড়ে চলেগেছে … শেষ সাত দিন ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলো…
…
সেদিন আমি ভারাক্রান্ত
মন নিয়ে ওখান থেকে বাড়ি চলে এলাম, সেদিন রাতে আমি আর ঘুমোতে পারিনি।
এভাবে পুঁজিপতি দের জন্য
কতো সংসার যে ভেসে যাচ্ছে তা প্রসাসন একবার ও চিন্তা করেনা ওরা ওদের গদি সামলাতেই ব্যেস্ত…
…
https://draft.blogger.com/blog/post/edit/3455216574940354281/936855135561182840

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Please do not enter any spam link in the comment box.